দাম্পত্য সমস্যা ও সামাধান -১
দাম্পত্য সমস্যা ও সমাধান - ১

আমাদের দাম্পত্য পরিবারের যাত্রা শুরুর সময়েই আমরা বলেছিলাম, আমরা চাই আমাদের পৃথিবীর সবচাইতে মূল্যবান প্র্তিষ্ঠান পরিবার যেন সুন্দর, ভালোবাসাপূর্ণ, হৃদ্যতাপূর্ণ হয় তাই কিছু টিপস, আইডিয়া আমরা শেয়ার করব। এতে আপনাদের সকল চিন্তা ও আইডিয়াও আমরা গ্রহণ করব আন্তরিকভাবে যেন একটা সুন্দর সমাজ গঠনে আমরা সবাই একসাথে এগিয়ে যেতে পারি।
সেই সাথে কাউন্সিলের কথাও আমরা বলেছিলাম, আমাদের সাথে কেউ তাদের সমস্যা শেয়ার করলে তা আমরা যোগ্য কাউন্সেলরদের মাধ্যমে সমাধান বা আলাপ জানিয়ে দিব -- যা হবে ইসলামের আলোকে। একজন বোন তার একটা সমস্যা জানিয়েছিলেন, তাকে যেই উত্তরটা দেয়া হয়েছিল তা তার অনুমুতি সাপেক্ষে আমরা প্রকাশ করছি নোট আকারে -- যেন তা অন্যান্যদের কাজে লাগে।
আল্লাহ আমাদের পরিবারগুলোতে পারস্পারিক ভালোবাসা-হৃদ্যতা-সম্মান বাড়িয়ে দিন যেন তা আখিরাতে মুক্তির উসিলা হয় এবং তা শান্তির জায়গাতে পরিণত হয়।
দাম্পত্য সমস্যা - ১:
আসসালামু আলাইকুম। আমি প্রবাসে থাকি। আমার স্বামী একজন ইঞ্জিনিয়ার। আমাদের বিয়ের অনেক দিন হয়ে গেল, (চার বছরেরও বেশি), এখনো কোন সন্তান হয়নি, কিছু শারীরিক সমস্যা আছে, ইনশাআল্লাহ চিকিৎসার মাধ্যমে ঠিক হওয়ার পথে। আমার স্বামী এ ব্যাপারে কখনো অভিযোগ করেন নি।
আমার স্বামীর বয়স ত্রিশ পার হয়ে যাওয়ার পরেও পরিবার থেকে বিয়ের কোন ব্যবস্থা না করায় তিনি নিজেই পরিচিতজনের মাধ্যমে বিয়ের উদ্যোগ নেন, এবং উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হয়।
কিন্তু প্রথম থেকেই আমার শাশুড়ি আমাকে বিভিন্ন ভাবে কটাক্ষ করত, কথা শোনাত। এর পর আমার দেবরের বিয়ের পর পর দুই ছেলে সন্তান হওয়ার পরে আমার শাশুড়ি আর আমার স্বামীর ভাইবোনেরা আমার জীবনে হেন কোন রকম নেই যে আমাকে কষ্ট দেয়নি। আল্লাহ স্বাক্ষী, আমি প্রথম থেকেই আমার স্বামীর জন্য দু'আ করি। নামায পড়ে আল্লাহর কাছে সব সময় দোয়া চাই। তার পরিবারে আমি সব কিছু দেয়ার চেষ্টা করেছি, কাউকে কষ্ট দেইনি, কোন কিছু নিয়ে উনাদের দুশ্চিন্তায় ফেলতে চাইনি।
আমার স্বামী দেশে খুব ছোট একটা চাকুরি করত। আমিই তার দুর্দিনে সব কষ্ট করি। আজকে এত ভালো পর্যায়ে আসার পেছনে আমার অনেক কষ্টের অবদান আছে। অথচ সে কিছু দিন আগে দেশে গিয়ে মেয়েদের সাথে ইন্টারনেট এ চ্যাট করেছে, যদিও পরে ক্ষমা চেয়েছে।
আমি আর পারছি না! শ্বশুর বাড়ির জন্য এত কিছু করার পরেও সেদিন দেবরের বউ এর গালিগালাজ শুনতে হল। আর শাশুড়ি কেবল মাত্র গিফট, দামি জিনিসপত্র আশা করে, স্বামী কেবল মুখ বন্ধ করে থাকে।
যখন বিয়ে করেছি, বয়স অনেক কম ছিল। জীবনে যার জন্য সব ত্যাগ করলাম, এত কষ্ট করলাম, এত দু'আ করলাম যাদের জন্য এত.... কিছু করার চেষ্টা করলাম, আজ সব এমন হয়ে যাচ্ছে কেন! আর পারিনা, বিশ্বাস করবেন, আজ আমার বিবাহ বার্ষিকী, কিন্তু মন থেকে সব সুখ হারিয়ে গেছে।
দোয়া করবেন, আর আমাকে একটা কোন উপায় বলবেন আমি কী করতে পারি।
সমাধান : Response from the Counselor:
আসসালামু আলাইকুম ফারজানা আপু,
আপনার বার্তাটা পড়লাম, দু’টো জিনিস মাথায় এলো। একটু বিস্তারিতই আলাপ করি।
যেকোন মেয়েই বিয়ের পর (এক্সেপশানাল কিছু ক্ষেত্রে ছাড়া) শ্বশুরবাড়ীর আদর চায়। সে উদ্দেশ্যে তারা সবার সাথে মিলেমিশে চলার চেষ্টা করে, সবার জন্য সাধ্যমত এমনকি অনেকসময় সাধ্যের বাইরেও করার চেষ্টা করে। কিছু কিছু সময় অপরপক্ষ থেকে অনুরূপ রেসপন্স পাওয়া যায়না, তখন ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায় প্রচন্ড কষ্টের। শাশুড়ি কেন ছেলেকে বিয়ে দিতে চাইছিলেন না সেটা স্পষ্ট হয়নি, তবে যেহেতু বললেন তখন উনার উপার্জন কম ছিল, হতে পারে তিনি চান নি ছেলের উপার্জনে ভাগীদারের সংখ্যা আর বাড়ুক। ইসলাম বলে প্রত্যেক ব্যক্তির রিজিক আল্লাহ তার সাথেই দিয়ে দেন। কিন্তু আমাদের আগের জেনারেশনের লোকজন মূলত ইসলাম পালন করতেন একটি সামাজিক আচার হিসেবে, এর সাথে বিশ্বাসের বা কর্মের তেমন সম্পৃক্ততা ছিলোনা। তাই আপনার শাশুড়ি কোন এক্সেপশানাল কেস না। তার উপর আমাদের দেশের বাবামায়েরা মনে করেন সংসার ছেলেমেয়ে করবে কিন্তু বিয়ে উনারা করাবেন, অর্থাৎ পছন্দ থেকে অনুষ্ঠান, বৌ কীভাবে চলবে সব হবে তাঁদের কথামত। এর মধ্যে যখন ছেলে নিজের পছন্দে বিয়ে করল তখন তাঁদের কী অবস্থা হয় একবার ভাবুন তো!
আরেকটা জিনিস যেটা আমরা অনেকসময় ওভারলুক করি সেটা হোল, কেউ খুশি হবার জন্য দু’টো উপাদান প্রয়োজন হয়- যে খুশি করতে চায় তার আন্তরিকতা এবং যাকে খুশি করার প্রচেষ্টা করা হয় তার হৃদ্যতা। আপনি যতই আন্তরিক হোন, যাঁরা খুশি না হতে বদ্ধ্বপরিকর তাঁদের খুশি করতে পারবেন না। এঁরা খুশি হতে চান না, সুতরাং এঁদের খুশি করা সম্ভব না।
এতগুলি কথা বললাম শুধু পরিস্থিতি বিশ্ল্বেষণ করার জন্য। এবার আসি সমাধানের দিকে। ইসলাম অনুযায়ী প্রথমত, আমাদের প্রতিটি কথা এবং প্রতিটি কাজ হওয়া উচিত শুধু এবং কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। সেদিক থেকে কাউকে খুশি করার সংকল্পই ভুল। ভেবে দেখুন, আপনি আপনার শ্বশুরবাড়ীর সবার জন্য যা করেছেন তা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করতেন সব আপনার জমার খাতায় থাকত, কেউ খুশি না হলেও আল্লাহ আপনার ওপর সন্তুষ্ট হতেন এবং তিনি আপনার ওপর সন্তুষ্ট এটা মনে করেই আপনার সব দুঃখ সহনীয় হয়ে যেত। দ্বিতীয়ত, বাবা মা হিসেবে যে হক, তা কেবল নিজের ছেলেমেয়ের উপর। আপনার শ্বশুর শাশুড়ির প্রতি আপনার কোন বাড়তি দায়িত্ব নেই একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের দায়িত্ব ছাড়া। (http://www.islamqa.info/en/ref/6388/husband%20parent)
তাহলে প্রশ্ন আসে, আমরা শ্বশুরবাড়ীর জন্য করি কেন? ব্যাপারটা খুব সহজ। প্রথমত, যেহেতু এখানে আমার কোন দায়িত্ব নেই, সেহেতু আমি যতটুকুই করব তার পুরোটুকুই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, অর্থাৎ জমার খাতায়। দ্বিতীয়ত, আমি যেমন চাই আমার স্বামী আমার পরিবারের প্রতি সৌজন্যমূলক আচরণ করুক, তেমনি সেও নিশ্চয়ই মুখে না বললেও খুশি হবে যদি আমি তার পরিবারের প্রতি ভাল আচরণ করি, পক্ষান্তরে এর মাধ্যমে আমাদের মাঝেই সম্পর্ক উন্নত হবে। সুতরাং, আমার পরামর্শ হোল, আপনি আপনার নিয়াত পরিবর্তন করুন, স্থির করে নিন যে আপনি তাঁদের জন্য সে সবই করবেন যা এতদিন করে এসেছেন, তবে এবার করবেন আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য, তখন আপনাকে পুরস্কৃত করার দায়িত্ব আল্লাহর কাছে চলে যাবে এবং তিনি কারো ভাল আমল বিফলে যেতে দেন না, পৃথিবীতে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হলেও আখিরাতে তিনি আপনাকে সন্তুষ্ট করে দেবেন ইনশাল্লাহ।
আপনার স্বামীর ব্যাপারটা হোল, তিনি যদি আপনার কষ্ট লাঘব করার উদ্দেশ্যে তার পরিবারকে কিছু বলতে যান তাহলে সেটা দ্বিগুণ হয়ে আপনার ওপর ফিরে আসবে। ‘আমাদের ছেলে তো এমন ছিলোনা, বৌ ওকে শিখিয়ে দিয়েছে বলেই তো সে আমাদের সাথে এমন ব্যাবহার করল’, এইসব আজেবাজে অপবাদে আপনার জীবন দুর্বিসহ হয়ে যাবে। আবার এটা তিনি আপনার সাথেও আলাপ করতে পারেন না যেহেতু আপনি তাঁকে কাপুরুষ মনে করবেন। এই অবস্থাগুলিতে অনেকে দিগভ্রান্ত হয়, যেমন উনি চ্যাট করে সমস্যা ভুলে থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে বিপথে জড়িয়ে পড়ছিলেন। আল্লাহ বলেছেন, স্বামীস্ত্রী পরস্পরের পরিচ্ছদস্বরূপ। পরিচ্ছদ একে অপরের ত্রুটি ঢেকে রাখে। সুতরাং, দাম্পত্য কিন্তু শুধু পরস্পরের ভালটুকু গ্রহণ করা নয় বরং দুর্বলতাগুলো থেকে উত্তরণের জন্য একে অপরকে সাহায্য করাও বটে। সেদিক থেকে তো আপনি অনেক ভাল অবস্থানে আছেন, দেশের বাইরে আছেন, দু’জনে কিছু সময় একান্তে বসে ওদের ভুলে থাকার সময় পান। তাঁর পরিবারকে নিয়ে খোঁটাখুঁটি করে যদি আপনাদের মাঝে সম্পর্ক নষ্ট হয় তাহলে তো দূরে থেকেও তাঁদের উদ্দেশ্য সফল হয়, আর আপনি কাছে থেকেও একটি সুখের নীড় গড়ে তোলার সুযোগটা নষ্ট করে ফেলছেন নিজ হাতেই। তাঁদেরকে আপনাদের মাঝে দেয়াল হতে দেবেন না, বরং দু’জন মিলেই একটি দেয়াল গড়ে তুলুন যাতে তাঁদের আঘাতে নিজেরা ক্ষতবিক্ষত না হন। দু’জনের বন্ধুত্ব মজবুত করে গড়ে তুলুন যেন অন্য কেউ আপনাদের মাঝে ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি করার সুযোগ না পান।
আর সন্তানের ব্যাপারটা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেয়াই ভাল যেহেতু তিনিই সবচেয়ে ভাল জানেন কখন এবং কিভাবে দিলে সে সন্তান আমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। এই ব্যাপারে কাউকে প্রশয় দেবেন না, বলবেন এই সিদ্ধান্ত আমার হাতে নয়।
আপনি বলেছেন আপনি তাঁদের জন্য সবসময় দু’আ করেন, এখন থেকে নিজের জন্যও দু’আ করবেন, আল্লাহ নিজের জন্য নিজের দু’আ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন।
আশা করি এর মাধ্যমে কিছু উপকার পাবেন। পরবর্তী পরিস্থিতি জানালে খুশি হব।
মাআসসালাম।
মুল লেখা
আমাদের দাম্পত্য পরিবারের যাত্রা শুরুর সময়েই আমরা বলেছিলাম, আমরা চাই আমাদের পৃথিবীর সবচাইতে মূল্যবান প্র্তিষ্ঠান পরিবার যেন সুন্দর, ভালোবাসাপূর্ণ, হৃদ্যতাপূর্ণ হয় তাই কিছু টিপস, আইডিয়া আমরা শেয়ার করব। এতে আপনাদের সকল চিন্তা ও আইডিয়াও আমরা গ্রহণ করব আন্তরিকভাবে যেন একটা সুন্দর সমাজ গঠনে আমরা সবাই একসাথে এগিয়ে যেতে পারি।
সেই সাথে কাউন্সিলের কথাও আমরা বলেছিলাম, আমাদের সাথে কেউ তাদের সমস্যা শেয়ার করলে তা আমরা যোগ্য কাউন্সেলরদের মাধ্যমে সমাধান বা আলাপ জানিয়ে দিব -- যা হবে ইসলামের আলোকে। একজন বোন তার একটা সমস্যা জানিয়েছিলেন, তাকে যেই উত্তরটা দেয়া হয়েছিল তা তার অনুমুতি সাপেক্ষে আমরা প্রকাশ করছি নোট আকারে -- যেন তা অন্যান্যদের কাজে লাগে।
আল্লাহ আমাদের পরিবারগুলোতে পারস্পারিক ভালোবাসা-হৃদ্যতা-সম্মান বাড়িয়ে দিন যেন তা আখিরাতে মুক্তির উসিলা হয় এবং তা শান্তির জায়গাতে পরিণত হয়।
দাম্পত্য সমস্যা - ১:
আসসালামু আলাইকুম। আমি প্রবাসে থাকি। আমার স্বামী একজন ইঞ্জিনিয়ার। আমাদের বিয়ের অনেক দিন হয়ে গেল, (চার বছরেরও বেশি), এখনো কোন সন্তান হয়নি, কিছু শারীরিক সমস্যা আছে, ইনশাআল্লাহ চিকিৎসার মাধ্যমে ঠিক হওয়ার পথে। আমার স্বামী এ ব্যাপারে কখনো অভিযোগ করেন নি।
আমার স্বামীর বয়স ত্রিশ পার হয়ে যাওয়ার পরেও পরিবার থেকে বিয়ের কোন ব্যবস্থা না করায় তিনি নিজেই পরিচিতজনের মাধ্যমে বিয়ের উদ্যোগ নেন, এবং উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হয়।
কিন্তু প্রথম থেকেই আমার শাশুড়ি আমাকে বিভিন্ন ভাবে কটাক্ষ করত, কথা শোনাত। এর পর আমার দেবরের বিয়ের পর পর দুই ছেলে সন্তান হওয়ার পরে আমার শাশুড়ি আর আমার স্বামীর ভাইবোনেরা আমার জীবনে হেন কোন রকম নেই যে আমাকে কষ্ট দেয়নি। আল্লাহ স্বাক্ষী, আমি প্রথম থেকেই আমার স্বামীর জন্য দু'আ করি। নামায পড়ে আল্লাহর কাছে সব সময় দোয়া চাই। তার পরিবারে আমি সব কিছু দেয়ার চেষ্টা করেছি, কাউকে কষ্ট দেইনি, কোন কিছু নিয়ে উনাদের দুশ্চিন্তায় ফেলতে চাইনি।
আমার স্বামী দেশে খুব ছোট একটা চাকুরি করত। আমিই তার দুর্দিনে সব কষ্ট করি। আজকে এত ভালো পর্যায়ে আসার পেছনে আমার অনেক কষ্টের অবদান আছে। অথচ সে কিছু দিন আগে দেশে গিয়ে মেয়েদের সাথে ইন্টারনেট এ চ্যাট করেছে, যদিও পরে ক্ষমা চেয়েছে।
আমি আর পারছি না! শ্বশুর বাড়ির জন্য এত কিছু করার পরেও সেদিন দেবরের বউ এর গালিগালাজ শুনতে হল। আর শাশুড়ি কেবল মাত্র গিফট, দামি জিনিসপত্র আশা করে, স্বামী কেবল মুখ বন্ধ করে থাকে।
যখন বিয়ে করেছি, বয়স অনেক কম ছিল। জীবনে যার জন্য সব ত্যাগ করলাম, এত কষ্ট করলাম, এত দু'আ করলাম যাদের জন্য এত.... কিছু করার চেষ্টা করলাম, আজ সব এমন হয়ে যাচ্ছে কেন! আর পারিনা, বিশ্বাস করবেন, আজ আমার বিবাহ বার্ষিকী, কিন্তু মন থেকে সব সুখ হারিয়ে গেছে।
দোয়া করবেন, আর আমাকে একটা কোন উপায় বলবেন আমি কী করতে পারি।
- ফারজানা (ছদ্মনাম)
সমাধান : Response from the Counselor:
আসসালামু আলাইকুম ফারজানা আপু,
আপনার বার্তাটা পড়লাম, দু’টো জিনিস মাথায় এলো। একটু বিস্তারিতই আলাপ করি।
যেকোন মেয়েই বিয়ের পর (এক্সেপশানাল কিছু ক্ষেত্রে ছাড়া) শ্বশুরবাড়ীর আদর চায়। সে উদ্দেশ্যে তারা সবার সাথে মিলেমিশে চলার চেষ্টা করে, সবার জন্য সাধ্যমত এমনকি অনেকসময় সাধ্যের বাইরেও করার চেষ্টা করে। কিছু কিছু সময় অপরপক্ষ থেকে অনুরূপ রেসপন্স পাওয়া যায়না, তখন ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায় প্রচন্ড কষ্টের। শাশুড়ি কেন ছেলেকে বিয়ে দিতে চাইছিলেন না সেটা স্পষ্ট হয়নি, তবে যেহেতু বললেন তখন উনার উপার্জন কম ছিল, হতে পারে তিনি চান নি ছেলের উপার্জনে ভাগীদারের সংখ্যা আর বাড়ুক। ইসলাম বলে প্রত্যেক ব্যক্তির রিজিক আল্লাহ তার সাথেই দিয়ে দেন। কিন্তু আমাদের আগের জেনারেশনের লোকজন মূলত ইসলাম পালন করতেন একটি সামাজিক আচার হিসেবে, এর সাথে বিশ্বাসের বা কর্মের তেমন সম্পৃক্ততা ছিলোনা। তাই আপনার শাশুড়ি কোন এক্সেপশানাল কেস না। তার উপর আমাদের দেশের বাবামায়েরা মনে করেন সংসার ছেলেমেয়ে করবে কিন্তু বিয়ে উনারা করাবেন, অর্থাৎ পছন্দ থেকে অনুষ্ঠান, বৌ কীভাবে চলবে সব হবে তাঁদের কথামত। এর মধ্যে যখন ছেলে নিজের পছন্দে বিয়ে করল তখন তাঁদের কী অবস্থা হয় একবার ভাবুন তো!
আরেকটা জিনিস যেটা আমরা অনেকসময় ওভারলুক করি সেটা হোল, কেউ খুশি হবার জন্য দু’টো উপাদান প্রয়োজন হয়- যে খুশি করতে চায় তার আন্তরিকতা এবং যাকে খুশি করার প্রচেষ্টা করা হয় তার হৃদ্যতা। আপনি যতই আন্তরিক হোন, যাঁরা খুশি না হতে বদ্ধ্বপরিকর তাঁদের খুশি করতে পারবেন না। এঁরা খুশি হতে চান না, সুতরাং এঁদের খুশি করা সম্ভব না।
এতগুলি কথা বললাম শুধু পরিস্থিতি বিশ্ল্বেষণ করার জন্য। এবার আসি সমাধানের দিকে। ইসলাম অনুযায়ী প্রথমত, আমাদের প্রতিটি কথা এবং প্রতিটি কাজ হওয়া উচিত শুধু এবং কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। সেদিক থেকে কাউকে খুশি করার সংকল্পই ভুল। ভেবে দেখুন, আপনি আপনার শ্বশুরবাড়ীর সবার জন্য যা করেছেন তা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করতেন সব আপনার জমার খাতায় থাকত, কেউ খুশি না হলেও আল্লাহ আপনার ওপর সন্তুষ্ট হতেন এবং তিনি আপনার ওপর সন্তুষ্ট এটা মনে করেই আপনার সব দুঃখ সহনীয় হয়ে যেত। দ্বিতীয়ত, বাবা মা হিসেবে যে হক, তা কেবল নিজের ছেলেমেয়ের উপর। আপনার শ্বশুর শাশুড়ির প্রতি আপনার কোন বাড়তি দায়িত্ব নেই একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের দায়িত্ব ছাড়া। (http://www.islamqa.info/en/ref/6388/husband%20parent)
তাহলে প্রশ্ন আসে, আমরা শ্বশুরবাড়ীর জন্য করি কেন? ব্যাপারটা খুব সহজ। প্রথমত, যেহেতু এখানে আমার কোন দায়িত্ব নেই, সেহেতু আমি যতটুকুই করব তার পুরোটুকুই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, অর্থাৎ জমার খাতায়। দ্বিতীয়ত, আমি যেমন চাই আমার স্বামী আমার পরিবারের প্রতি সৌজন্যমূলক আচরণ করুক, তেমনি সেও নিশ্চয়ই মুখে না বললেও খুশি হবে যদি আমি তার পরিবারের প্রতি ভাল আচরণ করি, পক্ষান্তরে এর মাধ্যমে আমাদের মাঝেই সম্পর্ক উন্নত হবে। সুতরাং, আমার পরামর্শ হোল, আপনি আপনার নিয়াত পরিবর্তন করুন, স্থির করে নিন যে আপনি তাঁদের জন্য সে সবই করবেন যা এতদিন করে এসেছেন, তবে এবার করবেন আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য, তখন আপনাকে পুরস্কৃত করার দায়িত্ব আল্লাহর কাছে চলে যাবে এবং তিনি কারো ভাল আমল বিফলে যেতে দেন না, পৃথিবীতে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হলেও আখিরাতে তিনি আপনাকে সন্তুষ্ট করে দেবেন ইনশাল্লাহ।
আপনার স্বামীর ব্যাপারটা হোল, তিনি যদি আপনার কষ্ট লাঘব করার উদ্দেশ্যে তার পরিবারকে কিছু বলতে যান তাহলে সেটা দ্বিগুণ হয়ে আপনার ওপর ফিরে আসবে। ‘আমাদের ছেলে তো এমন ছিলোনা, বৌ ওকে শিখিয়ে দিয়েছে বলেই তো সে আমাদের সাথে এমন ব্যাবহার করল’, এইসব আজেবাজে অপবাদে আপনার জীবন দুর্বিসহ হয়ে যাবে। আবার এটা তিনি আপনার সাথেও আলাপ করতে পারেন না যেহেতু আপনি তাঁকে কাপুরুষ মনে করবেন। এই অবস্থাগুলিতে অনেকে দিগভ্রান্ত হয়, যেমন উনি চ্যাট করে সমস্যা ভুলে থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে বিপথে জড়িয়ে পড়ছিলেন। আল্লাহ বলেছেন, স্বামীস্ত্রী পরস্পরের পরিচ্ছদস্বরূপ। পরিচ্ছদ একে অপরের ত্রুটি ঢেকে রাখে। সুতরাং, দাম্পত্য কিন্তু শুধু পরস্পরের ভালটুকু গ্রহণ করা নয় বরং দুর্বলতাগুলো থেকে উত্তরণের জন্য একে অপরকে সাহায্য করাও বটে। সেদিক থেকে তো আপনি অনেক ভাল অবস্থানে আছেন, দেশের বাইরে আছেন, দু’জনে কিছু সময় একান্তে বসে ওদের ভুলে থাকার সময় পান। তাঁর পরিবারকে নিয়ে খোঁটাখুঁটি করে যদি আপনাদের মাঝে সম্পর্ক নষ্ট হয় তাহলে তো দূরে থেকেও তাঁদের উদ্দেশ্য সফল হয়, আর আপনি কাছে থেকেও একটি সুখের নীড় গড়ে তোলার সুযোগটা নষ্ট করে ফেলছেন নিজ হাতেই। তাঁদেরকে আপনাদের মাঝে দেয়াল হতে দেবেন না, বরং দু’জন মিলেই একটি দেয়াল গড়ে তুলুন যাতে তাঁদের আঘাতে নিজেরা ক্ষতবিক্ষত না হন। দু’জনের বন্ধুত্ব মজবুত করে গড়ে তুলুন যেন অন্য কেউ আপনাদের মাঝে ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি করার সুযোগ না পান।
আর সন্তানের ব্যাপারটা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেয়াই ভাল যেহেতু তিনিই সবচেয়ে ভাল জানেন কখন এবং কিভাবে দিলে সে সন্তান আমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। এই ব্যাপারে কাউকে প্রশয় দেবেন না, বলবেন এই সিদ্ধান্ত আমার হাতে নয়।
আপনি বলেছেন আপনি তাঁদের জন্য সবসময় দু’আ করেন, এখন থেকে নিজের জন্যও দু’আ করবেন, আল্লাহ নিজের জন্য নিজের দু’আ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন।
আশা করি এর মাধ্যমে কিছু উপকার পাবেন। পরবর্তী পরিস্থিতি জানালে খুশি হব।
মাআসসালাম।
মুল লেখা
Comments
Post a Comment